কারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল ?

🕊️ কারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল? — রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম, যা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। এই যুদ্ধে সবাই এক পক্ষে ছিলেন না। অভ্যন্তরীণভাবে কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী ও আধা-সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়। এই লেখায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী প্রধান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা, তাদের প্রেক্ষাপট এবং এর ফলাফল বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।


📜 ঐতিহাসিক পটভূমি: মুক্তিযুদ্ধ ও বিরোধিতার উৎস

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে গণহত্যা শুরু করে, যার ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে যারা দাঁড়িয়েছিল, তাদের অনেকেরই ছিল ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ—কেউ পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে চেয়েছিল, কেউ ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল, আবার কেউ ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল।


🏛️ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দল: যারা সংগঠিতভাবে বিরোধিতা করেছিল

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে সংগঠিত ও সুস্পষ্ট। ২০২৬ সালে পাস হওয়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২-এর উপধারা ১০-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তাদের এদেশীয় দোসর, আল বদর, আল শামস, রাজাকার, তৎকালীন মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী-র বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, তারাই মুক্তিযোদ্ধা। এই আইনি স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে এই দলগুলোর বিরোধিতার বিষয়টি সংসদীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

🕌 জামায়াতে ইসলামী

জামায়াতে ইসলামী ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সংগঠিত ও সুস্পষ্ট বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল। দলটি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং মুক্তিযুদ্ধকে “পাকিস্তানবিরোধী ষড়যন্ত্র” হিসেবে চিহ্নিত করে। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ-এর সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল আল-বদর বাহিনী, যার প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। আল-বদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যা, ঘরবাড়ি লুটপাট এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে পথ দেখানোর মতো কাজে সরাসরি জড়িত ছিল। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ২০২৬ সালে সংসদে বলেছেন, “জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, সেটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য”। তবে জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব দাবি করেন, তারা মূলত ভারতের বিরুদ্ধে ছিল, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নয়—যদিও এই দাবি ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত।

🏛️ মুসলিম লীগ

তৎকালীন মুসলিম লীগ ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের মূল রাজনৈতিক শক্তি এবং ১৯৭১ সালে তারা পাকিস্তানি জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। মুসলিম লীগের অনেক নেতা শান্তি কমিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, যা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করত। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন আইনে মুসলিম লীগকে স্পষ্টভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

🕌 নেজামে ইসলাম পার্টি

নেজামে ইসলাম পার্টি ছিল একটি ইসলামি রাজনৈতিক দল, যা পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার পক্ষে ছিল। দলটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে নেজামে ইসলাম পার্টিকেও বিরোধিতাকারী দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

🔴 বামপন্থী দলগুলোর বিভ্রান্তি

সব বিরোধিতা ডানপন্থী বা ধর্মীয় দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কিছু বামপন্থী গোষ্ঠীও চীন-সোভিয়েত দ্বন্দ্বের কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তিতে ছিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাসদ ও জাসদ-এর মতো বাম দলগুলোর মধ্যে কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধকে “ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র” হিসেবে দেখেছিল। তবে সব বাম দল বিরোধিতা করেনি; অনেক বামপন্থী যোদ্ধা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। গবেষকদের মতে, বামদের মধ্যে “স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিশ্বাসী বাম” এবং “মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী বাম”—উভয় ধরনের অবস্থান ছিল।


⚔️ আধা-সামরিক বাহিনী ও মিলিশিয়া: পাকিস্তানের সহযোগী শক্তি

রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি আধা-সামরিক বাহিনী সরাসরি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল।

🎯 আল-বদর বাহিনী

আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়েছিল ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়ে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী মিলিশিয়া হিসেবে। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। আল-বদর বাহিনী বিশেষভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা-র জন্য কুখ্যাত—১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদসহ বহু বুদ্ধিজীবীকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। আল-বদর বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে বাড়ি বাড়ি নিয়ে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে সহায়তা করত।

🎯 আল-শামস বাহিনী

আল-শামস ছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গঠিত একটি নিন্দিত আধা-সামরিক মিলিশিয়া বাহিনী, যা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সাকা চৌধুরী। আল-শামস বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে হত্যা, লুটপাট ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল।

🎯 রাজাকার বাহিনী

রাজাকার বাহিনী ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশীয় দোসর, যারা স্থানীয়ভাবে গঠিত হয় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে। রাজাকারদের প্রশিক্ষণ দিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী, এবং তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই, ঘরবাড়ি লুটপাট ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। শান্তি কমিটি নামে পরিচিত স্থানীয় সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমেও পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করা হতো।


🌍 আন্তর্জাতিক শক্তি: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকা

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা কেবল অভ্যন্তরীণ শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়।

🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রশাসন পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে সমর্থন দেয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে “তলাবিহীন ঝুড়ি” বলে অবহেলার বাক্য ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য একটি কূটনৈতিক চাপ ছিল।

🇨🇳 চীন

চীনও শুরু থেকে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। চীন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা প্রদান করে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে প্রস্তাবের বিরোধিতায় চীন ভূমিকা রাখে।

🌍 অন্যান্য দেশ

মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, ইরান ও শ্রীলংকাসহ কয়েকটি দেশ পাকিস্তানের পক্ষে বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় অবস্থান নেয়। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল, যা যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে。


❓ সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত ১০টি প্রশ্ন ও উত্তর

১. ❓ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা প্রধান রাজনৈতিক দল কোনগুলো ছিল?

উত্তর: প্রধানত জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম পার্টি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ এই দলগুলোর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২. ❓ আল-বদর বাহিনী কী এবং কারা এটি গঠন করেছিল?

উত্তর: আল-বদর ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী একটি আধা-সামরিক মিলিশিয়া, যা ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। এর প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। বাহিনীটি বুদ্ধিজীবী হত্যা ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল।

৩. ❓ রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: তিনটিই পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী আধা-সামরিক বাহিনী ছিল। রাজাকার স্থানীয়ভাবে গঠিত হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করত; আল-বদর ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘভিত্তিক, যা বুদ্ধিজীবী হত্যায় বিশেষভাবে জড়িত; আল-শামস ছিল আরেকটি মিলিশিয়া, যার নেতৃত্বে ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সাকা চৌধুরী।

৪. ❓ কোন দেশগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল?

উত্তর: প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়。এছাড়া যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক ও ইরানসহ কয়েকটি দেশও পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়।

৫. ❓ যুক্তরাষ্ট্র কেন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল?

উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে চীনের বিরুদ্ধে একটি মিত্র হিসেবে ধরে রাখা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব মোকাবিলা করা। তাই তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে ছিল।

৬. ❓ জামায়াতে ইসলামী কি আজও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার দায় স্বীকার করে?

উত্তর: না, জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব সরাসরি দায় স্বীকার করে না। তারা দাবি করে, তারা মূলত ভারতের বিরুদ্ধে ছিল, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নয়। তবে ২০২৫ সালে ৩২ জন বিশিষ্ট নাগরিক জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার দায় স্বীকার করার আহ্বান জানান।

৭. ❓ মুসলিম লীগ কি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল?

উত্তর: হ্যাঁ। তৎকালীন মুসলিম লীগ পাকিস্তানি জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল এবং শান্তি কমিটি গঠনে সহায়তা করেছিল। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে মুসলিম লীগকে বিরোধিতাকারী দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৮. ❓ কোনো বাম দল কি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল?

উত্তর: কিছু বাম গোষ্ঠী চীন-সোভিয়েত দ্বন্দ্বের কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্ত ছিল এবং কেউ কেউ এর বিরোধিতা করেছিল। তবে সব বাম দল বিরোধিতা করেনি; অনেক বামপন্থী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

৯. ❓ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ কী নেওয়া হয়েছে?

উত্তর: ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন-এর অধীনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়। ২০১০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন হয়। এছাড়া ২০২৬ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন পাসের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বিরোধিতাকারী দলগুলোর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

১০. ❓ “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী” বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী” বলতে সাধারণত সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বোঝায় যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, অথবা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করে। এটি একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিভাষা, যা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়।


📌 মূল টেকঅওয়ে (Key Takeaways)

  • মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা কোনো একক গোষ্ঠীর কাজ ছিল না; এটি রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক—তিন স্তরে সংঘটিত হয়েছিল।

  • জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম পার্টি ছিল প্রধান রাজনৈতিক বিরোধিতাকারী শক্তি, যা ২০২৬ সালের আইনে স্পষ্টভাবে স্বীকৃত।

  • আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল।

  • যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল।

  • কিছু বাম গোষ্ঠীও বিভ্রান্তির কারণে বিরোধিতা করেছিল, তবে সব বাম দল নয়।

  • বিরোধিতার প্রধান কারণগুলো ছিল পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থ, ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনীতি, ধর্মীয় আদর্শ এবং ভারতবিরোধী অবস্থান।

  • মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আইনি ও বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এবং ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলমান।


✅ উপসংহার

“কারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল?”—এর উত্তর কোনো একটি নামে সীমাবদ্ধ নয়। অভ্যন্তরীণভাবে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম পার্টির মতো রাজনৈতিক দল, তাদের সহযোগী আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনী, এবং আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। তাদের বিরোধিতার পেছনে ছিল পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা, ক্ষমতা ধরে রাখা, ধর্মীয় আদর্শ এবং ঠান্ডা যুদ্ধের ভূরাজনীতি। এই বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে, এবং পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে。 ইতিহাসের এই অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা।


📚 তথ্যসূত্র (References)

  1. “মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি কারা, সেটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য : আইনমন্ত্রী”, বাসস, ১ মে ২০২৬। https://www.bssnews.net/bangla/national/303823

  2. “জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি, এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে গেছে: আইনমন্ত্রী”, বাংলা ট্রিবিউন, ১ মে ২০২৬। https://www.banglatribune.com/country/khulna/944595/

  3. “জামায়াতসহ স্বাধীনতাবিরোধী ৩ দলকে দায় মুক্তি দিতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার”, The Bangladesh Today, ৪ জুলাই ২০২৬। https://thebangladeshtoday.com/bangla/bangladesh/politics/2026/07/04/156990

  4. “ঘাতক আল-বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন নিজামী”, বিবিসি বাংলা, ২৯ অক্টোবর ২০১৪। https://www.bbc.com/bengali/news/2014/10/141029_mrk_bangladesh_albadr

  5. “আল শামস”, উইকিপিডিয়া (বাংলা), ২৪ মে ২০২৫। https://bn.m.wikipedia.org/wiki/আল_শামস

  6. “রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী”, সংগ্রামের নোটবুক, ২৬ নভেম্বর ২০২৩। https://songramernotebook.com

  7. “মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তি বলয়ে স্নায়ুযুদ্ধ: আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা”, বিডিনিউজ২৪, ১২ ডিসেম্বর ২০১৪। https://bangla.bdnews24.com

  8. “মুক্তিযুদ্ধে বহির্বিশ্বের কার কী ভূমিকা”, যুগান্তর, ৩০ ডিসেম্বর ২০২২। https://www.jugantor.com

  9. “যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে, স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন”, চ্যানেল আই অনলাইন, ১১ ডিসেম্বর ২০২৩। https://www.channelionline.com

  10. “মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে যেসব দেশ”, সময়ের আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫। https://www.shomoyeralo.com

  11. “মুক্তিযুদ্ধে বাম দলগুলোর ভূমিকা”, বিডিনিউজ২৪, ২৫ মার্চ ২০১১। https://bangla.bdnews24.com

  12. “মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী দল: স্বীকৃতি-অস্বীকৃতি”, প্রথম আলো, ২৬ মার্চ ২০২৫। https://www.prothomalo.com

  13. “জামায়াত মুক্তিযুদ্ধ নয়, ভারতের বিরুদ্ধে ছিল: আমির হামজা”, বিডিনিউজ২৪, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫। https://bangla.bdnews24.com

  14. “মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আসলে জামায়াতের অবস্থান কী?”, বাংলা ট্রিবিউন, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬。 https://www.banglatribune.com

  15. “বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা, তিন বছর পর ঢাকায় কিসিঞ্জার”, প্রথম আলো, ৩০ অক্টোবর ২০২৬। https://www.prothomalo.com

  16. “কোন কোন দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল?”, সাত্তা একাডেমি, ৭ জুন ২০২৪। https://sattacademy.com

  17. “জামায়াতে ইসলামীকে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার দায় স্বীকার করার আহ্বান ৩২ নাগরিকের”, বাংলা ট্রিবিউন, ৭ আগস্ট ২০২৫。 https://www.banglatribune.com

  18. “জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার দায় স্বীকারের আহ্বান ৩২ বিশিষ্ট নাগরিকের”, প্রথম আলো, ৭ আগস্ট ২০২৫। https://www.prothomalo.com

  19. “জামায়াত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত : আইনমন্ত্রী”, কালবেলা, ১ মে ২০২৬। https://www.kalbela.com

  20. “জামুকা সংশোধনে বিল পাস: জামায়াতের আপত্তি, এনসিপির সমর্থন”, আগামীর সময়, ৯ এপ্রিল ২০২৬। https://www.agamirsomoy.com

Was it helpfull? Rate this article:
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)

Loading...

Scroll to Top