বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে শ্রমিক কাকে বলে ?

🇧🇩 বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে “শ্রমিক” কাকে বলে? — একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান আইনের মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৫)। এই আইনের প্রায় সব অধিকার, সুরক্ষা ও সুবিধা নির্ভর করে একজন ব্যক্তি “শ্রমিক” হিসেবে গণ্য হবেন কি না তার উপর। শ্রমিকের সংজ্ঞা না জানলে বোঝা যায় না কে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারবেন, কে ক্ষতিপূরণ পাবেন, কার জন্য কর্মঘণ্টা ও ছুটির বিধান প্রযোজ্য। এই লেখায় ধারা ২(৬৫)-এর সংজ্ঞা, এর উপাদান, বাদ পড়া ব্যক্তিবর্গ, ২০২৫ সালের সংশোধনের প্রভাব এবং ব্যবহারিক প্রশ্নোত্তর বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।


📜 ভূমিকা: কেন “শ্রমিক” সংজ্ঞা এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ একটি দ্বৈত কাঠামোয় চলছে—যারা “শ্রমিক” তাদের জন্য আইনের পূর্ণ সুরক্ষা (কর্মঘণ্টা, ছুটি, ন্যূনতম মজুরি, ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার) প্রযোজ্য; আর যারা “শ্রমিক” নন, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণ চুক্তি আইন (Contract Act, 1872) ও কোম্পানির নিজস্ব নীতি প্রযোজ্য হয়। ফলে “শ্রমিক” শব্দটির ব্যাখ্যা নির্ধারণ করে দেয় একজন কর্মীর আইনি ভাগ্য। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাস হওয়া শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এই সংজ্ঞায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে—বিশেষ করে ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে কর্মরতদের পূর্বের বাদ দেওয়ার বিধান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।


⚖️ ধারা ২(৬৫)-এ “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৬৫) -তে “শ্রমিক” (Worker) শব্দের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধনের পর সংজ্ঞাটি নিম্নরূপ:

“শ্রমিক” অর্থ যেকোনো ব্যক্তি, শিক্ষানবিশ বা প্রশিক্ষণরত ব্যক্তিসহ, যার চাকরির শর্তাবলি প্রকাশ্য বা উহ্য যেভাবেই থাকুক না কেন, যিনি কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে সরাসরি বা ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক বা কেরানিগিরির কাজ করেন; এবং এই শব্দের অন্তর্ভুক্ত সেইসব ব্যক্তি যারা “কর্মচারী” বা “অফিসার” নামে অভিহিত হন, তবে যারা ধারা ২(৪৯)(খ)-এর অধীনে নিয়োজিত তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।

পূর্ববর্তী (২০২৫-পূর্ব) সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে বলা ছিল যে, “প্রধানত ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকি ক্ষমতায় নিয়োজিত ব্যক্তি” শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। ২০২৫ সালের সংশোধনী সেই বাদ দেওয়ার বিধানটি সরিয়ে দিয়েছে, ফলে বহু সংখ্যক “সাদা কলার” কর্মীও এখন শ্রমিকের আওতায় এসেছেন।


🧩 সংজ্ঞার মূল উপাদানসমূহ

ধারা ২(৬৫)-এর সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত উপাদানগুলো পাওয়া যায়:

👤 যেকোনো ব্যক্তি (শিক্ষানবিশ ও প্রশিক্ষণরতসহ)

শিক্ষানবিশ (Apprentice) এবং প্রশিক্ষণরত (Trainee) ব্যক্তিরাও শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত। আইনে “শিক্ষানবিশ” বলতে এমন শিক্ষার্থীকে বোঝায় যিনি প্রশিক্ষণের সময় ভাতা পান। ফলে প্রশিক্ষণকালীন অবস্থাতেও আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়।

🏢 প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে নিয়োগ

শ্রমিককে অবশ্যই কোনো “প্রতিষ্ঠান” (Establishment) বা “শিল্প” (Industry)-এ নিয়োজিত হতে হবে। ধারা ২(৬৫)-এর সাথে ধারা ১(৪) মিলিয়ে পড়লে দেখা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠান (যেমন সরকারি অফিস, প্রতিরক্ষা কারখানা, কিছু শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) আইনের আওতার বাইরে। তবে সেই বাদ দেওয়া প্রতিষ্ঠানেও দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ অধ্যায়ের ক্ষেত্রে কিছু শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

🔗 সরাসরি বা ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ

শ্রমিক সরাসরি মালিকের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারেন, অথবা কোনো ঠিকাদার (Contractor)-এর মাধ্যমে নিয়োজিত হতে পারেন। ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ হলেও তিনি শ্রমিক হিসেবে গণ্য হবেন এবং আইনের সুরক্ষা পাবেন। এটি নির্মাণ ও তৈরি পোশাক খাতের মতো খাতগুলোতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

💰 মজুরি বা অর্থের বিনিময়

শ্রমিকের কাজের বিনিময়ে মজুরি বা অর্থ প্রদান করা হয়। “মজুরি” বলতে শুধু নগদ অর্থ নয়, অন্যান্য সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে শর্ত হলো—কাজটি “hire or reward” (ভাড়া বা পারিশ্রমিক)-এর ভিত্তিতে হতে হবে।

🛠️ কাজের ধরন

আইনে কাজের ধরন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: দক্ষ (skilled), অদক্ষ (unskilled), কায়িক (manual), কারিগরি (technical), ব্যবসা উন্নয়নমূলক (business development), এবং কেরানিগিরি (clerical)। ২০২৫ সালের সংশোধনীতে “business development” যোগ করা হয়েছে, যা আগে “trade promotional” নামে ছিল। বিচারিক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, কাজের প্রকৃতি ও দায়িত্বের ধরন দেখে নির্ধারণ করতে হবে—পদের নাম দেখে নয়।

📄 চাকরির শর্ত প্রকাশ্য বা উহ্য

চাকরির শর্তাবলি লিখিত (express) বা মৌখিক/অনুমিত (implied)—যেভাবেই থাকুক না কেন, শ্রমিকের সংজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ লিখিত চুক্তি না থাকলেও শ্রমিকের অধিকার অস্বীকার করা যাবে না।


🚫 কারা “শ্রমিক” নন? (ব্যতিক্রমসমূহ)

ধারা ২(৬৫)-এর সংজ্ঞায় কিছু ব্যক্তিকে স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, এবং ধারা ১(৪)-এ কিছু প্রতিষ্ঠান/শ্রমিককে আইনের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধনের পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।

🏛️ ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকি পদ

২০২৫ সালের সংশোধনের পূর্বে যারা প্রধানত ব্যবস্থাপনামূলক (managerial), প্রশাসনিক (administrative) বা তদারকি (supervisory) কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তারা শ্রমিকের সংজ্ঞার বাইরে ছিলেন। ২০২৫ সালের সংশোধনী এই বাদ দেওয়ার বিধানটি সরিয়ে দিয়েছে, ফলে এখন “কর্মচারী” বা “অফিসার” নামে অভিহিত ব্যক্তিরাও শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত। তবে ধারা ২(৪৯)(খ)-এর অধীনে কিছু ব্যক্তি এখনও বাদ পড়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন আইন দ্বারা নিয়োগ ও চাকরির শর্ত নিয়ন্ত্রিত কিছু সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারী।

🏭 ধারা ১(৪)-এ বাদ দেওয়া প্রতিষ্ঠান

আইনের ধারা ১(৪) অনুযায়ী নিম্নলিখিত প্রতিষ্ঠান বা শ্রমিকদের উপর আইন প্রযোজ্য নয় (কিছু ক্ষেত্রে আংশিক ব্যতিক্রমসহ):

  • সরকার বা সরকারের অধীনস্থ অফিস

  • সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস

  • সমরাস্ত্র কারখানা

  • প্রকাশ্য প্রদর্শনীর খুচরা দোকান (প্রদর্শনীর সহায়ক হলে)

  • ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে স্থাপিত দোকান

  • অলাভজনক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান

  • সংবিধানের ৬২, ৭৯, ১১৩ বা ১৩৩ অনুচ্ছেদের অধীন আইনে নিয়ন্ত্রিত কিছু শ্রমিক (তবে রেল, ডাক, সড়ক, গণপূর্ত, স্বাস্থ্য প্রকৌশল ও সরকারি মুদ্রণালয়ের শ্রমিকরা দ্বাদশ-চতুর্দশ অধ্যায়ের জন্য অন্তর্ভুক্ত)

  • কিছু সমুদ্রগামী জাহাজের শ্রমিক (ষোড়শ অধ্যায় ব্যতীত)

  • পাঁচজনের কম শ্রমিক নিয়োজিত কৃষি খামার (দ্বাদশ-চতুর্দশ অধ্যায় ব্যতীত)

  • গৃহকর্মী (দ্বাদশ-চতুর্দশ অধ্যায় ব্যতীত)

  • পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠান যেখানে বাইরের শ্রমিক নেই


🔄 ২০২৫ সালের সংশোধনী: কী বদলাল?

শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ শ্রমিকের সংজ্ঞায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। মূল পরিবর্তনগুলো:

  1. ব্যবস্থাপনামূলক/প্রশাসনিক/তদারকি বাদ দেওয়া বিলুপ্ত: পূর্বে এই শ্রেণির কর্মীরা শ্রমিকের আওতায় ছিলেন না; এখন তারা অন্তর্ভুক্ত।

  2. “কর্মচারী” বা “অফিসার” পদবিধারীরাও অন্তর্ভুক্ত: পদবি যাই হোক, কাজের প্রকৃতি দেখে শ্রমিক নির্ধারণ হবে।

  3. “Business development” কাজের স্বীকৃতি: পূর্বে “trade promotional” ছিল, এখন “business development” যুক্ত হয়েছে।

  4. “শিক্ষার্থী” শব্দটি সংজ্ঞায় যুক্ত: শুধু শিক্ষানবিশ নয়, শিক্ষার্থীও অন্তর্ভুক্ত।

  5. সামুদ্রিক জাহাজের শ্রমিকদের সুরক্ষা সম্প্রসারণ: সমুদ্রগামী জাহাজের শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা বাড়ানো হয়েছে।

এই সংশোধনের ফলে বিপুল সংখ্যক সাদা কলার কর্মী—যেমন ব্যাংক কর্মকর্তা, বিপণন প্রতিনিধি, প্রশাসনিক সহকারী—শ্রম আইনের আওতায় এসেছেন।


🆚 “শ্রমিক” বনাম “কর্মচারী” (Worker vs. Employee): পার্থক্য কী?

বাংলাদেশের শ্রম আইনে “শ্রমিক” (Worker) এবং “কর্মচারী” (Employee) শব্দ দুটি এক নয়। ঐতিহাসিকভাবে, “শ্রমিক” বলতে কায়িক, কারিগরি বা কেরানিগিরির কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বোঝানো হতো, যারা আইনের পূর্ণ সুরক্ষা পেতেন। অন্যদিকে “কর্মচারী” বা “স্টাফ” বলতে ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকি ভূমিকায় নিয়োজিতদের বোঝানো হতো, যারা শ্রম আইনের বাইরে থেকে শুধু চুক্তি আইনের অধীনে ছিলেন।

২০২৫ সালের সংশোধনের পর এই দ্বৈত কাঠামো অনেকাংশে দুর্বল হয়েছে, কারণ ব্যবস্থাপনামূলক পদেও কর্মরতদের শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে—যেমন ধারা ২(৪৯)(খ)-এর অধীনে নিয়োজিত ব্যক্তি—এখনও পার্থক্য বিদ্যমান।


🏷️ শ্রমিকের প্রকারভেদ

শ্রম আইনে বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের উল্লেখ রয়েছে, যারা সবাই ধারা ২(৬৫)-এর মূল সংজ্ঞার আওতাভুক্ত:

  • স্থায়ী শ্রমিক (Permanent Worker): কোনো প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োজিত এবং পরীক্ষাকাল সফলভাবে সম্পন্নকারী।

  • অস্থায়ী শ্রমিক (Temporary Worker): সীমিত সময়ের জন্য নিয়োজিত, যে কাজ শীঘ্রই শেষ হবে।

  • আকস্মিক শ্রমিক (Casual Worker): কোনো প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রকৃতির কাজে অনিয়মিত ভিত্তিতে নিয়োজিত।

  • পরীক্ষাধীন শ্রমিক (Probationer): স্থায়ী শূন্য পদে সাময়িকভাবে নিয়োজিত এবং পরীক্ষাকাল অসম্পূর্ণ।

  • বদলি শ্রমিক (Badli Worker): কোনো স্থায়ী বা পরীক্ষাধীন শ্রমিক সাময়িক অনুপস্থিত থাকলে তার পদে নিয়োজিত।

  • শিক্ষানবিশ (Apprentice): প্রশিক্ষণকালীন ভাতাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী।

এছাড়াও ২০২৫ সালের সংশোধনের পর ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং স্ব-নিয়োজিত শ্রমিককেও কিছু অধ্যায়ের জন্য শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


💡 কেন এই সংজ্ঞা জানা জরুরি?

শ্রমিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয় নিম্নলিখিত অধিকার ও সুরক্ষা প্রাপ্তি:

  • ন্যূনতম মজুরি ও মজুরি পরিশোধের সময়সীমা

  • কর্মঘণ্টা (দৈনিক ৮ ঘণ্টা, সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা) ও ওভারটাইম ভাতা

  • সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসব ছুটি ও বার্ষিক ছুটি

  • অসুস্থতা, মাতৃত্ব ও অন্যান্য ছুটি

  • চাকরি থেকে অব্যাহতি বা ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ

  • কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ

  • ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও সদস্য হওয়ার অধিকার

  • শ্রম আদালতে মামলা করার অধিকার

যারা শ্রমিক নন, তারা এই সুরক্ষাগুলো থেকে বঞ্চিত হন এবং তাদের অধিকার নির্ভর করে চুক্তি ও কোম্পানির নীতির উপর।


❓ শ্রমিক সংজ্ঞা নিয়ে সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত ১০টি প্রশ্ন ও উত্তর

১. ❓ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিক কাকে বলে?

উত্তর: ধারা ২(৬৫) অনুযায়ী, শ্রমিক হলেন যেকোনো ব্যক্তি (শিক্ষানবিশ ও প্রশিক্ষণরতসহ) যিনি কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে সরাসরি বা ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক বা কেরানিগিরির কাজ করেন; চাকরির শর্ত প্রকাশ্য বা উহ্য যেভাবেই থাকুক না কেন।

২. ❓ ২০২৫ সালের সংশোধনের পর ব্যবস্থাপকরা কি শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন?

উত্তর: হ্যাঁ। ২০২৫ সালের শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ পূর্বের সেই বাদ দেওয়ার বিধান সরিয়ে দিয়েছে যেখানে বলা ছিল “প্রধানত ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকি ক্ষমতায় নিয়োজিত ব্যক্তি শ্রমিক নন।” এখন “কর্মচারী” বা “অফিসার” পদবিধারীরাও শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত, যদি না তারা ধারা ২(৪৯)(খ)-এর অধীনে পড়েন।

৩. ❓ ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি কি শ্রমিক?

উত্তর: হ্যাঁ। ধারা ২(৬৫)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরাসরি বা ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই শ্রমিকের সংজ্ঞা প্রযোজ্য। ঠিকাদার দ্বারা সরবরাহকৃত শ্রমিকগণও শ্রম আইনের আওতাভুক্ত।

৪. ❓ শিক্ষানবিশ কি শ্রমিক হিসেবে গণ্য?

উত্তর: হ্যাঁ। “শিক্ষানবিশসহ যেকোনো ব্যক্তি” শব্দবন্ধটি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত। ২০২৫ সালের সংশোধনে “শিক্ষার্থী” শব্দটিও যুক্ত হয়েছে।

৫. ❓ কোনো প্রতিষ্ঠান কি শ্রম আইনের আওতার বাইরে থাকতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ, ধারা ১(৪)-এ কিছু প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়েছে—যেমন সরকারি অফিস, সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস, সমরাস্ত্র কারখানা, অলাভজনক শিক্ষা/গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। তবে কিছু ক্ষেত্রে দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ অধ্যায়ের জন্য ব্যতিক্রম রয়েছে।

৬. ❓ “কর্মচারী” এবং “শ্রমিক”-এর মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: ঐতিহাসিকভাবে “শ্রমিক” বলতে কায়িক, কারিগরি বা কেরানিগিরির কাজে নিয়োজিতদের বোঝাত, যারা পূর্ণ আইনি সুরক্ষা পেত; “কর্মচারী” বলতে ব্যবস্থাপনামূলক বা প্রশাসনিক ভূমিকায় নিয়োজিতদের বোঝাত, যারা শ্রম আইনের বাইরে ছিলেন। ২০২৫ সালের সংশোধনের পর এই পার্থক্য অনেকটা কমে এসেছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে (ধারা ২(৪৯)(খ)) এখনও বিদ্যমান।

৭. ❓ শ্রমিকের সংজ্ঞা কি কেবল কায়িক শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য?

উত্তর: না। সংজ্ঞায় “দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক বা কেরানিগিরি” কাজের উল্লেখ আছে। ২০২৫ সালের সংশোধনের পর “business development” কাজও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা বিপণন ও বিক্রয় সংক্রান্ত পেশাদারদেরও শ্রমিকের আওতায় আনে।

৮. ❓ চাকরির কোনো লিখিত চুক্তি না থাকলে কি শ্রমিকের অধিকার পাওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ। সংজ্ঞায় বলা হয়েছে “চাকরির শর্তাবলি প্রকাশ্য বা উহ্য যেভাবেই থাকুক না কেন।” লিখিত চুক্তি না থাকলেও মৌখিক বা অনুমিত শর্তের ভিত্তিতে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

৯. ❓ একজন “সুপারভাইজার” কি শ্রমিক?

উত্তর: ২০২৫ সালের সংশোধনের পূর্বে যারা প্রধানত তদারকি কাজে নিয়োজিত ছিলেন তারা শ্রমিকের বাইরে ছিলেন। কিন্তু সংশোধনের পর সেই বাদ দেওয়া বিলুপ্ত হওয়ায় সুপারভাইজাররাও শ্রমিকের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যদি না তারা ধারা ২(৪৯)(খ)-এর অধীনে পড়েন। তবে বিচারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কাজের প্রকৃতি ও দায়িত্বের মাত্রা দেখে নির্ধারণ করতে হবে—শুধু পদবি দেখে নয়।

১০. ❓ শ্রমিকের সংজ্ঞা লঙ্ঘন হলে কোথায় অভিযোগ করা যায়?

উত্তর: শ্রমিকের সংজ্ঞা সংক্রান্ত বিরোধ বা শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ শ্রম আদালতে (Labour Court) দায়ের করা যায়। এছাড়াও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এবং শ্রম অধিদপ্তর (DOL)-এ অভিযোগ করা যেতে পারে।


📌 মূল টেকঅওয়ে (Key Takeaways)

  • ধারা ২(৬৫) বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা আইনের প্রায় সব সুরক্ষার মূল ভিত্তি。

  • সংজ্ঞায় শিক্ষানবিশ, প্রশিক্ষণরত, ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োজিত এবং “কর্মচারী”/”অফিসার” পদবিধারীরাও অন্তর্ভুক্ত।

  • ২০২৫ সালের সংশোধনী ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে কর্মরতদের পূর্বের বাদ দেওয়ার বিধান সরিয়ে দিয়েছে, ফলে শ্রমিকের পরিধি ব্যাপকভাবে расшиত হয়েছে。

  • ধারা ১(৪)-এ কিছু প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিককে আইনের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে আংশিক ব্যতিক্রম রয়েছে।

  • “শ্রমিক” নন এমন ব্যক্তিরা শ্রম আইনের সুরক্ষা পান না; তাদের অধিকার চুক্তি ও কোম্পানির নীতির উপর নির্ভর করে।

  • কাজের প্রকৃতি ও দায়িত্ব দেখে শ্রমিক নির্ধারণ করতে হয়, শুধু পদের নাম দেখে নয়—এটি বিচারিক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত।

  • শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে শ্রম আদালত, DIFE ও DOL-এ প্রতিকার চাওয়া যায়।


✅ উপসংহার

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৬৫)-এ “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা কেবল একটি আইনি পরিভাষা নয়—এটি নির্ধারণ করে দেয় কে রাষ্ট্রীয় শ্রম সুরক্ষার আওতায় আসবেন এবং কে বাইরে থাকবেন। ২০২৫ সালের সংশোধনী এই সংজ্ঞাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে, বিশেষ করে ব্যবস্থাপনামূলক ও প্রশাসনিক পদে কর্মরতদের শ্রমিকের আওতায় এনে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে এখনও বাদ রাখা হয়েছে, এবং বিচারিক ব্যাখ্যায় কাজের প্রকৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক, মালিক,HR পেশাদার, আইনজীবী ও নীতিনির্ধারক—সবার জন্যই এই সংজ্ঞাটি সঠিকভাবে বোঝা অপরিহার্য, কারণ এর উপরই নির্ভর করে শ্রম অধিকারের কার্যকারিতা।


📚 তথ্যসূত্র (References)

  1. বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ — বাংলাদেশ সরকারি আইন বিভাগ। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-952.html

  2. বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (ধারা ২(৬৫) সংজ্ঞা) — bdlaws.minlaw.gov.bd। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-952/chapter-details-1031.html

  3. Bangladesh Labour Act 2006 — ILO EPlex Legal Coverage। https://eplex.ilo.org/index.php/legal-coverage#7

  4. করোনাকালীন সময়ে শ্রম আইন — Lawyers Club Bangladesh, ২০২০। https://lawyersclubbangladesh.com/2020/10/18/করোনাকালীন-সময়-শ্রম-আইন/

  5. Bangladesh Labour Law Amendment 2025: A New Era of Compliance Challenges for Employers — Mahbub & Company, ২০২৬। https://mahbub-law.com/bangladesh-labour-law-amendment-2025-a-new-era-of-compliance-challenges-for-employers/

  6. In the affidavit-in-opposition (Writ Petition No. 11672 of 2021) — Supreme Court of Bangladesh। https://supremecourt.gov.bd/resources/documents/1990860_WRIT_PETITION_NO.11672_OF_2021.pdf

  7. Law and Our Rights — The Daily Star, ২০১২। https://childrights.thedailystar.net/law/2012/04/04/advocate.htm

  8. Definition of Workers and Application of the Bangladesh Labour Act 2006: An Appraisal — EJCLS ADAPT। https://ejcls.adapt.it/index.php/ejcls_adapt/article/download/846/1087

  9. Asian Legal Insights: Bangladesh Special Edition Part 4 — Mori Hamada & Matsumoto, ২০২৬। https://www.morihamada.com/ja/insights/newsletters/146401

  10. HC questions legality of excluding private-sector managers from ‘workers’ definition — The Business Standard, ২০২৬। https://www.tbsnews.net

  11. Is Your “Manager” Actually a “Worker”? The Latest Bangladesh Labour Law Perspective — Accord Chambers, ২০২৬। https://accordchambers.com

  12. Bangladesh Labour Act 2025 Amendments: A Brief Overview — Kazi Law Chamber, ২০২৬। https://mail.kazilawchamber.com

  13. Legal coverage — ILO EPlex (Bangladesh country detail)। https://eplex.ilo.org/index.php/legal-coverage

  14. Employee Rights & Labour Law in Bangladesh — Tahmidur Rahman, ২০২০। https://tahmidurrahman.com

  15. Employee’s Rights at Workplace in Bangladesh — IR Global, ২০২১। https://irglobal.com

  16. Navigating Legal Waters: Independent Contractors’ Status In Bangladesh — Mondaq, ২০২৬। https://webiis08.mondaq.com

  17. At a glance: issuing an employment rights claim in Bangladesh — Lexology, ২০২৬। https://www.lexology.com

  18. Bangladesh Labour Act, 2006 — Doulah & Doulah। https://www.doulah.net

  19. Bangladesh Labour Act 2006 — bdcode.gov.bd (PDF)। http://bdcode.gov.bd/upload/bdcodeact/2020-11-20-08-33-44-235_Vol-38_Act_no_42_of_2006.pdf

  20. ৩.১.১ শ্রম আইনের সর্বজনীন প্রযোজ্যতা ও শ্রমিকের স্বীকৃতি — BILS। https://bilsbd.org

  21. আমাদের শ্রম আইনে মালিক শ্রমিক অধিকার প্রসঙ্গে — দৈনিক আজাদী, ২০২১। https://dainikazadi.net

  22. অবহেলীত শ্রমিক সমাজ, মে দিবস ও আমাদের শ্রম আইন — Lawyers Club Bangladesh, ২০১৮। https://lawyersclubbangladesh.com

  23. Bangladesh Labour Act 2006 – A complete Overview — Tahmidur Rahman। https://tahmidurrahman.com

  24. “Worker” definition under Section 2(65) — Vertex Chambers, ২০১৩। https://www.vertexchambers.com

  25. Bangladesh Labour (Amendment) Ordinance, 2025 — LinkedIn analysis by Md. Saifur Rahman। https://www.linkedin.com

  26. Legal framework for employment and classification of workers — Mori Hamada & Matsumoto (Japanese version)। https://www.morihamada.com/ja/insights/newsletters/146396

  27. Bangladesh Labour Act 2006 (Section 2 definitions) — bdlaws.minlaw.gov.bd (Bengali)। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-952.html

  28. শ্রমিকের বিশেষ সংজ্ঞা ও সংগঠন করিবার অধিকার (ধারা ১৭৫) — bdlaws.minlaw.gov.bd। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-952/act-chapter-print-1043.html

  29. ঠিকাদার সংস্থা দ্বারা সরবরাহকৃত শ্রমিক — bdcode.gov.bd। http://bdcode.gov.bd

  30. Bangladesh Labour Act 2006 — ILO NATLEX। https://webapps.ilo.org

  31. Definition of “Worker” under Bangladesh Labour Act 2006 — The Daily Star Law Archive। https://childrights.thedailystar.net

  32. Bangladesh Labour Act 2006: Worker vs. Non-Worker — North South University Law Review। https://nsulawreview.org

  33. Employment Agreements in Bangladesh — Rivermate, ২০২৬। https://rivermate.com

  34. Bangladesh Labour Law Amendment 2025 — Mahbub & Company (full text)। https://mahbub-law.com

  35. HC questions legality of excluding private-sector managers — The Business Standard (full article)। https://www.tbsnews.net

  36. Is Your “Manager” Actually a “Worker”? — ACCORD Chambers (full article)। https://accordchambers.com

  37. Bangladesh Labour Act 2025 Amendments: A Brief Overview — Kazi Law Chamber (full article)। https://mail.kazilawchamber.com

  38. Legal coverage — ILO EPlex (main page)। https://eplex.ilo.org

  39. Employee Rights & Labour Law in Bangladesh — Tahmidur Rahman (full article)। https://tahmidurrahman.com

  40. Employee’s Rights at Workplace in Bangladesh — IR Global (full article)। https://irglobal.com

Was it helpfull? Rate this article:
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (5 votes, average: 4.80 out of 5)

Loading...

Scroll to Top